Tuesday, 27 October 2026 · বাংলা সংবাদBBARTA স্টাফ ডেস্ক ↗

আপনার এলাকার খবর, আপনার কণ্ঠে। খবর পাঠান, নির্বাচিত রিওয়ার্ড পান।

আপনিই রিপোর্টার ↗
স্থানীয় সংবাদ

চিনির দামে আগুন, কলকাতায় কেজি ৭০ টাকা; ইথানল (E20) বিতর্কে বাড়ছে উদ্বেগ

Sugar Prices Surge to ₹70/kg in Kolkata

কলকাতা: অসুখ-বিসুখের ভয় থাকলেও জিলিপি, সন্দেশ কিংবা এক কাপ চা—চিনি ছাড়া বাঙালির দৈনন্দিন জীবন যেন অসম্পূর্ণ। সেই চিনির দামই এখন গৃহস্থের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। গত দু’সপ্তাহে কলকাতার বাজারে চিনির দাম কেজি-প্রতি ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০ টাকা। অর্থাৎ, বৃদ্ধির হার ৪৫ শতাংশেরও বেশি। মাত্র সাত দিন আগেও দাম ছিল কেজি-প্রতি ৬০ টাকা।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

শনিবার কলকাতার পাইকারি বাজারে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম দাঁড়িয়েছে ৩,২৫০ টাকা, অর্থাৎ কেজি-প্রতি ৬৫ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহণ খরচ ও ব্যবসায়ীদের মুনাফা যোগ হয়ে খুচরো বাজারে দাম পৌঁছে যাচ্ছে ৭০ টাকায়।

পোস্তার পাইকারি ব্যবসায়ী বেঙ্কট কেজরীবালের অভিযোগ, ‘‘সব খেলা মিল মালিকদের। ঝোপ বুঝে প্রতিদিন দাম বাড়িয়ে যাচ্ছেন।’’ তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে কার্যত চিনি উৎপাদন হয় না বললেই চলে। মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ ও কর্নাটক থেকেই রাজ্যের সিংহভাগ চিনি আসে। ফলে ওই রাজ্যগুলিতে দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলার বাজারে।

চিনির এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে দেশজুড়ে চলা ইথানল বিতর্কও। ইরান ও রাশিয়ার যুদ্ধের আবহে পেট্রলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানোর অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ইথানল তৈরিতে চিনির ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। পোস্তার ব্যবসায়ীদের হিসেব অনুযায়ী, চলতি বছর ৩২ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি ইথানল তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, পেট্রলে ইথানল মেশাতে গিয়ে দেশের খাদ্যসুরক্ষার সঙ্গে আপস করছে কেন্দ্র।

যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, চিনির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে ই-২০ পেট্রল তৈরির কোনও সম্পর্ক নেই। খাদ্য মন্ত্রকের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইথানল তৈরির জন্য চিনির ব্যবহার সময়ের সঙ্গে কমানো হচ্ছে। ২০২২-’২৩ সালে ইথানল তৈরিতে ১২ শতাংশ চিনি ব্যবহার করা হলেও ২০২৫-’২৬ সালে তা কমে হয়েছে ৯ শতাংশ। পাশাপাশি, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ইথানল ভুট্টার মতো দানাশস্য থেকে তৈরি হয় বলেও জানিয়েছে কেন্দ্র।

এদিকে, পরিস্থিতি সামাল দিতে এক দশকেরও বেশি সময় পর বিদেশ থেকে চিনি আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ লক্ষ টন চিনি আমদানি করা যাবে এবং এর জন্য কোনও শুল্ক দিতে হবে না।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ব্যবসায়ীরা। কলাকার স্ট্রিটের এক পাইকারি চিনি ব্যবসায়ীর প্রশ্ন, ‘‘তা হলে মাস ছয়েক আগে ৭ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি রফতানি করতে দেওয়া হল কেন? এ বছর যে আখ উৎপাদন কম হবে, সে খবর কি সরকারের কাছে ছিল না?’’

অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত চলে দেশে চিনি উৎপাদনের মরসুম। ২০২৫-’২৬ সালে গোটা দেশে চিনি উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ৭৩ লক্ষ মেট্রিক টন। আগের বছর উৎপাদন হয়েছিল ২ কোটি ৯৩ লক্ষ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, এক বছরে উৎপাদন কমেছে ২০ লক্ষ মেট্রিক টন।

পোস্তার এক ব্যবসায়ীর দাবি, দেশে চিনির চাহিদা ও সম্ভাব্য জোগানের হিসাব প্রতি বছর চিনি শিল্পের পক্ষ থেকে সরকারকে দেওয়া হয়। বৃষ্টিপাত, চাষের পরিস্থিতি এবং উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করেও উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ বছর এল নিনোর প্রভাবে আখ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেই আশঙ্কাও অজানা থাকার কথা নয় বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।

তবে এখন চিনি আমদানি করেও দ্রুত সঙ্কট সামাল দেওয়া কঠিন বলে মনে করছেন পোস্তার ব্যবসায়ীরা। তাঁদের বক্তব্য, আমদানি করা হবে মূলত কাঁচা চিনি। সেটিকে পরিশোধন করে খাবারের উপযোগী করে বাজারে আনতে অন্তত দু’মাস সময় লাগতে পারে।

বাংলায় সঙ্কট আরও গভীর

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। কারণ, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যের মানচিত্রে কার্যত কোনও চিনিকল নেই। একসময় নদিয়ার পলাশি এবং বীরভূমের আমোদপুর ছিল চিনি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই সময় পোস্তায় একটি গলির নামই হয়ে গিয়েছিল ‘চিনি পট্টি’। এখন সেখানে চিনির বদলে সারি সারি পুঁথিমালার দোকান। একমাত্র ভারত ট্রেডার্স নামের একটি চিনির আড়ত এখনও কার্যত ‘চিনি পট্টি’র ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

পশ্চিমবঙ্গে বছরে প্রায় ২০ লক্ষ টন চিনি প্রয়োজন। অথচ রাজ্যে উৎপাদন হয় ১ লক্ষ টনেরও কম। পাশাপাশি কমছে আখ চাষও। ২০২৩-’২৪ সালে রাজ্যে ১১ লক্ষ টন আখ উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৪-’২৫ সালে তা কমে হয়েছে ৮.৮ লক্ষ টন।

আখের ওজনের মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ চিনি পাওয়া যায়। ফলে উৎপাদিত আখের পুরোটাই কাজে লাগানো হলেও রাজ্যে ৮০ হাজার টনের বেশি চিনি উৎপাদন সম্ভব নয়। তাই ভিন্‌রাজ্যের উপর নির্ভর করাই বাংলার একমাত্র ভরসা।

মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ ও কর্নাটক থেকে মালগাড়িতে চিনি আসে রাজ্যে। কলকাতার প্রধান ‘চিনি পয়েন্ট’ ডানকুনি রেল ইয়ার্ড। সেখান থেকে লরিতে করে কলকাতার পাশাপাশি হাওড়া, হুগলি, নদিয়া-সহ বিভিন্ন জেলায় এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় চিনি পাঠানো হয়। রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও এমন ‘চিনি পয়েন্ট’ রয়েছে। শিলিগুড়ির ‘চিনি পয়েন্ট’ থেকে সংলগ্ন জেলার পাশাপাশি অসমেও চিনি সরবরাহ করা হয়। কেউ কেউ আবার সরাসরি ট্রাকে করে চিনিকল থেকে চিনি আনান।

কোন চিনির দাম কত?

হেঁশেলে ব্যবহৃত চিনি মূলত তিন ধরনের। গুণমান ও দানার আকার অনুযায়ী রয়েছে ‘এম-৩০ ডোমেস্টিক’, ‘এস-এস’ এবং ‘এস-৩০’।

বাড়িতে মূলত ব্যবহৃত মোটা দানার ‘এম-৩০ ডোমেস্টিক’ চিনির চিনিকল-দর কুইন্টাল-পিছু ৬,৪৫০ টাকা। তুলনায় সরু দানার ‘এস-এস’ চিনির দাম ৬,৩৫০ টাকা। আর সবচেয়ে সরু দানার ‘এস-৩০’ চিনির দাম ৬,২৭০ থেকে ৬,৩১০ টাকা কুইন্টাল।

মিষ্টির দোকানে ব্যবহৃত চিনির জাত আলাদা। সেখানে মূলত ‘এল-৩০’ এবং ‘এম-৩০’ ব্যবহার করা হয়। ‘এল-৩০’-এর দাম কুইন্টাল-পিছু ৬,৬৫০ থেকে ৬,৬৭০ টাকা। ‘এম-৩০’-এর দাম ৬,০৫০ থেকে ৬,৬০০ টাকা।

তবে এগুলি চিনিকলের দর। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জিএসটি, পরিবহণ খরচ এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফা। ডিলার, সাব-ডিলার, পাইকারি ও খুচরো ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে সেই চিনি শেষ পর্যন্ত গৃহস্থের রান্নাঘরে পৌঁছতে পৌঁছতে কেজি-প্রতি ৭০ টাকা হয়ে যাচ্ছে।

পোস্তা মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক অরুণ কেডিয়ার কথায়, ‘‘বাংলায় চিনি উৎপাদন হলে সঙ্কট এত তীব্র হত না। দামের রাশ তো ভিন্‌রাজ্যের চিনিকল মালিকদের হাতে।’’

বেঙ্কট কেজরীবালেরও বক্তব্য, ‘‘মিলওয়ালারা দাম বাড়ালে আমরা কী করব? আমরা চিনি মজুত করে দাম বাড়াচ্ছি না।’’

চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ করুক, এমনটাই চাইছেন পোস্তার পাইকারি ব্যবসায়ীরা। একই দাবি মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদেরও। শুক্রবার কৃষি বিপণনমন্ত্রী দিলীপ ঘোষকে চিঠি দিয়েছে তাঁদের সংগঠন ‘মিষ্টি উদ্যোগ’।

সংগঠনের সভাপতি ধীমান দাস বলেন, ‘‘মিষ্টির বিক্রি কমে গিয়েছে। দাম বাড়ানোর আর জায়গা নেই। সামনে উৎসবের মরসুম। চিনির দামে লাগাম না পরালে সমস্যায় পড়ব।’’

চিনির এই ঊর্ধ্বমুখী দামে একদিকে যেমন চাপ বাড়ছে সাধারণ গৃহস্থের রান্নাঘরের বাজেটে, তেমনই উদ্বেগ বাড়ছে মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। সামনে উৎসবের মরসুমে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেটাই দেখার।

এই খবরে সংশোধন জানান

মতামত

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *